একদা অরণ্যে…
বাঘের নাম নিরেশ। ফেইসবুকে অবশ্য নাম দেয়া, ''King Bodonti", সাথে সাইবেরিয়ান টাইগার-এর প্রোফাইল পিক। লাঞ্চ টাইমে টেরিটরি'র পাশে দিয়ে হেঁটে যাবার সময় দেখে, আপন মনে এক চিত্রা হরিণ সেলফি তুলেই যাচ্ছে। নিরেশ বাঘ ভাবে, এই প্রজন্মের পশুরা এমন বেখেয়াল কেন? ভাবনায় বাঁধ সাধে চরম ক্ষুধা। কূট প্ল্যান করে নতুন আইফোন'টা বাগিয়ে ডাক দেয়,
"কি ডিয়ার?! একা একা সেলফি তুললে হবে? কাছে আসো আমার ফোন দিয়ে তুলি।"
হাজার হোক বাঘের ডাক। ভয়ে ফোন লক না করে এক পা দুই পা করে দুরে সরতে থাকে ডিয়ার। তবুও এড়াতে পারেনা বাঘের রিফ্লেক্স। হুঙ্কার দিয়ে নিরেশ একদম কাছে আসতেই কাঁপতে থাকা হরিণ-এর মাথা থেকে শিং জোড়া খুলে পড়ে। কন্ঠস্বর, 'ম্যা ম্যা' করে ওঠে।
নিরেশ: (হতবাক হয়ে) হোয়াট দা এফ!!! কস কি হরিণ?
আধো কান্না, আধো এক্সপ্লেইন করার স্বরে উত্তর আসে,
''ভাইয়া আমি খাসী, ট্রাস্ট মি। প্রোফাইল পিকচার দিবো, ছবি তুলতে মেকআপ নিসি, তাই চিনেন নাই। প্লিজ ভাইয়া, খেয়ে দিয়েন না!"
পুল সাইড ক্যাফেতে সার্ভ করলেও, ঘটনার আকস্মিকতায় নিরেশ বাঘ তখন খাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলো। চান্সে খাসি দৌড়। ফেইসবুকে নোটিফিকেশন,
"সিংহ- King number one posted in Food Bologar",
চেক না করেই নিরেশ বুঝলো জেব্রা বা মহিষ। দুঃখে প্রোফাইলে গিয়ে স্ট্যাটাস আপডেট দিলো,
''ফেইসবুক ধীরে ধীরে একটা জংগলে পরিণত হচ্ছে। এটার নাম হওয়া উচিত 'জাংগল বুক' !!! - Feeling irritated"
দ্যা জাংগল বুক
মানুষদের শেখানো হয়, ''বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃ ক্রোড়ে।'' যুগ পালটেছে। আজকাল শিশুরা খুব জলদি বন সাফ করতে লেগে যায়। ফাঁকা মাতৃক্রোড়ে জায়গা করে নেয় গ্যাজেট অথবা মইন আঙ্কেল। বন্যেরা জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে শরণাপন্ন হয় এনজিও গুলোর। তবে আমাদের প্রানীরয়েড সাফারি সিটি বন্যপ্রাণীদের জন্য খুবই নিরাপদ। রাজধানী সংলগ্ন ড্রাই রিভার থেকে মাত্র ২ ঘন্টার দূরত্বে, প্রায় ৬০০ একর জুড়ে এই ডিজিটাল অভয়ারণ্য। আধুনিক নগর জীবনের প্রধান দুটি সুবিধা এখানে রয়েছে। Updated Lifestyle এবং Updated Facebook. বাঘে-মহিষে এখানে এক সার্ভারে অনলাইন থাকে ২৪/৭। See more....
ক্লিক না করে নিরেশ দ্রুত নিচে স্ক্রল করতে থাকে। অসহ্য ক্ষুধা, একটা খাসী বাকরা বানায় দিয়ে গেলো আবার সিংহের ফুড রিভিউ,
''একদম অনেস্ট রিভিউ, অনেকদিন ধরেই GF বলছিলো ইস্ট সাইড ফিল্ডের চিত্রা হরিণ খাবো। আজকে তাই চলেই এলাম ওকে নিয়ে। একটু দৌড়াতে হয়েছে, তবে হরিণটা পেয়েছি এক কথায় ইয়ামি!!! আমরা দুজনে দেড়টা করে লেগ পিস্ খেয়েছি। আমার GF এর আবার নেইলস একটু ছোটো। ওকে instant চামুচ এনে দিলো। জোশ এক্সপেরিয়েন্স।
টেস্ট ৮/১০
এনভায়রনমেন্ট ৬/১০ (হায়েনা ঘুরে আশেপাশে)
সার্ভিস ৮/১০"
বিরক্ত নিরেশ মনে মনে বলে, আরে ভাই খাইসোস বুঝ্লাম, এখন পোস্টারিং করবি? নিচে আবার পিক দিসে। উফ! এইটাই শেষ না, কমেন্টে ফায়ার ফক্স নামে এক শিয়াল তার ফ্রেন্ডকে ট্যাগ করসে,
"@Laughing Hyena Bro চলেন যাই এখনি, আমার ট্রিট। Pls Inbox."
OMG!! কতবড় আন্কালচার্ড বাটপার। যতদুর মনে পরে, আগেরদিনও এই শিয়াল পোস্ট দিসে,
''সিটিতে reach এর মধ্যে মিষ্টি আঙুর কই পাওয়া যায়? একটু জানালে খুশি হবো। TIA."
Grrrrr করতে করতে নিরেশ চেক ইন দিলো ইস্ট সাইড ফিল্ডে। এক ব্লক পরেই হরিণদের লাউঞ্জ মতন কি যেন একটা আছে। ওখানেই যাবে এখন লাঞ্চ করতে। মাথার উপর ডালপালা গুলোতে শিম্পাঞ্জি-গরিলা কমিউনিটি। কোন কাজ নাই, সারাটা দিন এরা এই পেইজ সেই গ্রূপ থেকে ইনভাইটেশন পাঠাবে। ডেসপারেটলি খুঁজো, প্রাণী না জানোয়ার?, ওয়াইল্ড ফ্যাশন এইসব দিয়ে নিউজ ফিড জ্যাম করে দিবে। কিছু বললেই চেকইন শেয়ার দিয়ে দেয়। কে বুঝাবে ওদের? লোকেশন ফিড মানুষের জন্য ইন্টারেস্টিং হতে পারে, শিকারী প্রানীদের জন্য নয়।
''What?! Seriously?!'', নিরেশ বলে ওঠে। বলতে বলতে শেয়ার দিয়ে দিসে। ফোন থেকে মাথা উঠিয়ে ডিয়ার লাউঞ্জের সামনে নিরেশ প্যানোরোমিক ভিউতে দেখে, পুরো এলাকা প্রাণী শুন্য।
নিরেশ এর অনুভুতি নাম্ব হয়ে যেতে থাকে। ক্লান্তি, হতাশা আর ক্ষুধায় এলিয়ে পড়ে যায় নিরেশ। ফেইন্ট হয়ে যাবার আগে নিউজ ফিডে দেখতে পায় 'Dude পান্ডা'র স্ট্যাটাস আপডেট,
"I am selected as an Brand Ambassador of -ফ্যাশন হাউজ WRONG-, Feeling so Lucky Dada....Thanks!! Always thakben amar apon hoye."
(একটু দুরে হাতিরপুল এলাকায়)
Slim Eli নামের হাতিটি যাচ্ছিলো সিম বায়োমেট্রিক করতে। এই নিয়ে তিনবার গেলো সে রেজিস্ট্রেশন পয়েন্টে। প্রতিবারই আঙুলের ছাপ চাইলে শূর এগিয়ে দিচ্ছে, কিনতু মেশিন নিচ্ছেনা। টাপির আর বন্রুইও নাকি সেইম প্রবলেমে। শূর দিলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়না। Eli ভাবছে, এই প্রহসন যে কবে শেষ হবে?! আজকে ছাপ না নিলে গন্ডারকে দিয়ে করায় ফেলবে সিদ্ধান্ত নেয়। এক সিমের দৌড়ঝাপের জন্যে তার শুটিং পর্যন্ত মিস হয়ে যাচ্ছে। ঈদের টেলিফিল্ম, "ক্ষুদ্র নই ভদ্র আমি"তে হাতি ২ নাম্বার নায়িকা, মূল নায়িকা জলহস্তী। হাতি ওকে দেখতে পারেনা মোটেই। এলি চিন্তা করতে থাকে,
''শালি এই জলহস্তীটা একটা চিজ! ডিরেক্টর 'ইঁদুর ভাইয়ার সাথে সারাদিন ঢলাঢলি করে, কেমনে নায়িকা হয়ে গেলো। গতমাসে মালদ্বীপ ঘুরে আসছে দুইজন। 'থাই মানকি' নামে এক ফটোগ্রাফারকে দিয়ে আন্ডারওয়াটার ছবি তুলে আপ করসে আপ্পি, সাথে হ্যাশট্যাগ #জলমগ্ন হিপ্পোমনি। আমাকে একটু আগে ভাইবার করসে,
কি এলি!
মোটা হইসো দেখি!
শুনলাম টুথপেস্টের টিভিসি করসো?
পেমেন্ট পাইসো?
নাকি তোমরা শুধু মরলেই লাখ টাকা পাও?
Sorry, I didn't mean to offend!
TC
যত্তসব ফালতু লোকজন!"
এমন সময় হাতির মোবাইলে নোটিফিকেশন আসে,
"Dolphin, Cheetah, Penguin and 89 others were marked safe during the Tiger Attack at East Side Field."
নিজেকে সেইফ মার্ক করে নিউজ ফিড দেখতে থাকে হাতি। থাই মান্কির নতুন আন্ডার ওয়াটার শ্যুটের বিহাইন্ড দ্যা সিন অ্যালবাম দেখতে থাকে। মডেলরা আবার পোজ দিয়ে আফটার শ্যুট সেলফি দিয়েছে #prettyness. তবে এই প্রথম এলি লোকটাকে দেখলো। কোন মডেলের মোবাইল দিয়ে তোলা ছবি হয়তো। হাতি একটা সেলফিসহ কমেন্ট করে, "Love ur work!" ১০ সেকেন্ডের মাথায় আরেকটি নোটিফিকেশন পায় এলি।
"থাই মানকি হ্যাজ লাইকড ইওর কমেন্ট"
খুশিতে এলি ওয়াল পোস্টগুলো ইগনোর করে যায়। আনসিন থেকে যায় আজকের হট টপিক, মরা বাঘের সাথে সেলফি।
ইস্ট সাইড ফিল্ডে এদিকে নিরেশ এর হুঁশ ফিরেছে। মাথা প্রচন্ড ভার, কতক্ষণ ফেইন্ট ছিলো ভুলেও গিয়েছে। চোখ খুলে দেখে এক অবাক দৃশ্য, একটি খরগোশ তার ছবি তুলছে। থাবা বাড়িয়ে খপ করে তাকে ধরে ফেললো নিরেশ। ছবি কেন তুলছে কেন প্রশ্ন করতেই জানালো যে, কিছুদিন আগে এক কচ্ছপের সাথে রেইস করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত সে হেরে যায়। তার চেয়েও দুঃখজনক হলো কচ্ছপ তাকে ক্রস করে যাওয়ার সময় তার ঘুমন্ত অবস্থায় ছবি তুলে পোস্ট করে দিয়েছে। প্রচন্ড ইমেজ সংকটে থাকা খরগোশ নতুন একটা ফটোশপ করা প্রোফাইল পিকচার দিতে বাঘের ছবি তুলছে। খরগোশ এক্সপার্ট ফটো ম্যানিপুলেটর। কয়দিন আগে এক গাধার ছবিতে ফটোশপ করে জেব্রা বানিয়ে দিয়েছে। খরগোশ বললো,
"শকুন আর লেমুর এসে সেলফি তুলে গেলো, কিছু বললেন না। আমাকেই পাইলেন?!" বাঘ জানতে চাইলো সবাই কিভাবে জানলো তার অজ্ঞান হবার কথা? খরগোশ একঘন্টা আগে দেয়া কাঠবিড়ালির পোস্ট দেখালো নিরেশকে,
''আজকে রাস্তায় একটা মৃত বাঘকে পড়ে থাকতে দেখলাম। একটি স্বাধীন দেশে এভাবেই কে বা করা হত্যা করে ফেলে রেখে গেছে বাঘটিকে। কেউ কি এর স্বজনদের খোঁজ দিতে পারবে? আমাদের মানবতার পরিচয় কি আমরা দিতে পারবো? এড়িয়ে যাবেন না। পোস্টটি শেয়ার না দিয়ে যাবেন না।"
হতবাক নিরেশ খরগোশকে ছেড়ে দিয়ে নিজের প্রোফাইলে ঢোকে। ওয়াল জুড়ে সবার পোস্ট করা মরা বাঘের সাথে সেলফিগুলো দেখে রাগে ফোনটাই সুইচ অফ করে রাখে। বাড়ি এসে ফোন অন করতেই নিরেশ দেখে খরগোশ ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। প্রোফাইলে গিয়ে খরগোশের প্রোফাইল পিকচার দেখে নিরেশ তার একাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেয়। প্রতিজ্ঞা করে জীবনে কখনই ফেইসবুক ব্যবহার করবে না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন