আত্মহত্যা
বাংলায় অর্থ দাঁড়ায় নিজেকে হত্যা। হিন্দি বা উর্দু ভাষায় সমার্থক হলো খুদখুশী, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় মৃত্যু। আমি অবশ্য বাংলা শব্দটি নিয়েই লিখবো। বর্তমান সময়ে আমার কাছে আত্মহত্যা অর্থ নিজের স্বকীয়তা অথবা নিজের বিবেক বা আত্মাকে হত্যা। জীবনের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাদের চারিপাশে দেখছি সবাইকেই এই আত্মহত্যায় লিপ্ত। যা করা উচিত, যা বলা উচিত, যা হওয়া উচিত এবং যা ভাবা উচিত আমরা কোনভাবেই সেগুলো করতে পারছি না। আমরা হয়তো একজন সভ্য, সুন্দর এবং সত্য সত্ত্বা হতে পারতাম। কিন্তু নিজেদের হত্যা করে আমরা বেঁচে রয়েছি অন্য কেউ হিসেবে। অসংগতি তুলে ধরার জন্য আমার এই লেখার নামকরন করতে গিয়ে তাই আমি এই আত্মহত্যা শব্দটিকেই বেছে নিলাম।
পর্ব ১- ক্ষমা
সভ্য দেশের মানুষের সংস্পর্শে থেকে আর কাজের জন্য যা লেখাপড়া করতে হয়েছে, এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি আমাদের বেঁচে থাকার সৌন্দর্য আসলে সত্য এবং শিক্ষা দিয়ে তৈরি হয়। একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের সাথে আমাদের আচরন আর নৈতিকতার চর্চা এই দুটি বিষয় মানবজন্ম সফল করতে খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তবু আমরা এই দেশে নির্দিষ্ট এই দুইটি বিষয় নিয়েই চরম উদাসীন। আমরা জন্ম নেয়ার সময় আমাদের জন্ম নিবন্ধন বানানো হয় মিথ্যা তারিখ দিয়ে, ডাক্তার বাধ্য করে সি সেকশন বা সিজারিয়ান বেবী জন্ম দিতে, জন্মের পর গায়ের রং নিয়ে এক অদ্ভুত রেসিজম শুরু করি এবং বিশাল ব্যয়বহুল এই ঘটনা উদযাপনের মিষ্টি হাতে না পেলে জন্মদাত্রী এবং জন্মদাতাকে উদ্ধার করে ফেলি। সেই একই প্রক্রিয়ায় আমরা মৃত্যুর সময় সৎকারের খরচ আর নিয়ম নিয়ে জটিলতা করি, মৃতদেহ থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারন আর পরিবারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করি, মৃতের সৎকারের পরমুহুর্তেই সম্পত্তি সংক্রান্ত সংকল্পে মনোযোগ দিয়ে এবং জীবদ্দশায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও বিদেহীর জন্যে অশ্রুসিক্ত আবেগপাত শুরু করি। কথা কি ঠিক না বেঠিক?!
এবার ভাবুন আমরা যদি জীবনের শুরু আর শেষ এই দুই সময় এমন করতে পারি তাহলে মধ্যবর্তী সময় আমাদের কেমন যেতে পারে? ভয়ঙ্কর। বিশ্বাস করুন আসলেই ভয়ংকর। আমার দর্শন গুরু আমাকে একবার বুঝিয়েছিলেন যে জীবনের একক হলো একটি নিঃশ্বাস। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করে তখন প্রথম যেই কাজটি করে সেটা হলো বড় করে শ্বাস নেয়া (কান্না তারপর শুরু হয়) আর যখন সে মৃত্যুবরন করে তখন শেষ কাজটি করে একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে দেয়া (মৃত্যু সংবাদ খেয়াল করলেই দেখবেন লেখা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন)। সুতরাং যে কোন নিঃশ্বাস যখন শেষ নিঃশ্বাস হতে পারে তখন জীবনের একক আসলে একটি নিঃশ্বাস। অমোঘ নির্মম এই অনিশ্চয়তা আমরা তুড়ি মেরে পার করি সম্পূর্ন জীবন। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন আমরা মৃত্যুর আগে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে অভ্যস্ত। অথচ প্রতিদিন এই ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস করলেই কিন্তু পরকাল বেশ ঝুঁকিহীন হয়ে যায়। এমনকি স্নাইপারের আচমকা হেডশট লাগলেও কিন্তু শান্তিতে মরতে পারবেন। অনেকে আবার মাফ চাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে রাখে। রাস্তায় অপরিচিত এক ব্যক্তিকে গালি দিয়ে মোনাজাতে বলে, ইয়া মওলা রাস্তায় ওই ব্যাটাকে গালি দিলাম সে যেন আমাকে মাফ করে দেয়। পরম করুণাময় সর্বজ্ঞানী তখন অসীম দয়াশীল হবার কারনে এই দ্বিপাক্ষিক মাফের প্রক্রিয়া হয়তো নিজেই সমাধান করেন। নিশ্চিত বলতে পারলাম না কারন এই ক্ষমা প্রার্থনা সফল হয়েছে টাইপ নোটিফিকেশন পাওয়ার ব্যবস্থা ইহকালে নেই। থাকলে ভালো হতো। রাত বারোটায় হয়তো জানতে পারতাম, আজ আপনার গুনাহের সংখ্যা দশ, তার মধ্যে পাঁচটি মাফ করা হয়েছে। পরবর্তী ক্ষমা পেতে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। তবে রাগের মাথায় বা মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অপরাধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের নিকট তাৎক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে। মনে শান্তি আসে এবং সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা সেটেলমেন্টের জায়গায় তখন পূণ্য দান করে। একসময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর ঘটতে পারে না। জীবন হয় নিষ্পাপ, মন হয় শান্ত।
আমার এই লেখায় আমার প্রত্যক্ষ চরম বাস্তবতার বর্ণনা আর সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে কথাবার্তা থাকবে। শুরুর অধ্যায় দেখে এগুলো ব্যাখ্যা দেয়া, পরবর্তীতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
ধন্যবাদ।
নুরুল আফসার রাজ

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন